চাঁদাবাজি সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে দলকে ঢেলে সাজার উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। আসন্ন জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে অঙ্গ ও ভাতৃপ্রতিম সহযোগী সংগঠনগুলোর লাগাম টেনে ধরে নিয়ম–শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদচুত্য করে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করতে সক্ষম হয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। দুর্নীতি করলে সে যত বড় নেতাই হোক না কেন তাকে সরে যেতে হবে। কারও অন্যায়ের দায় দল নিবে না।

ক্যাডার, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের জঙ্গি ও মাদকের মতো নির্মূল করার ঘোষণায় দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিতর্কিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বিতর্কিত মন্ত্রী-এমপিসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলে এবং সহযোগী সংগঠনগুলোতে জবাবদিহিতার জন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর দল ও সরকারের ইমেজ রক্ষায় বেশ তৎপর রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের বিভিন্ন ফোরামে নেতাকর্মীদের সেই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন তিনি। সব ধরনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করতে নেতাকর্মীদের একাধিকবার আহ্বান জানান তিনি। 

দল ও সরকারের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল ও সরকারের কর্তাব্যক্তিদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের অনেক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ বা সরকারকে বিব্রত করেছে। তবে এবার চরম বিপদজনক পরিস্থিতি হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে বলছেন।

এদিকে গত শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ, অঙ্গ-সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের যারা চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত, যারা মানুষকে হয়রানি ও মাস্তানি করে তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। বর্তমান কমিটির মেয়াদ কাল, তিন বছরে মাত্র একটি জেলায় সম্মেলন হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এই মেয়াদে মাত্র একটি জেলায় সম্মেলন হলো কেন? বাকিগুলো কেন হলো না? আপনারা কী করেন? কে কী করেন সবার আমলনামা কিন্তু আমার কাছে রয়েছে। জেলায় জেলায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে আসেন, দলের কাজ তো কেউ করেন না। ব্যক্তি অপকর্মের দায় দল ও সরকার নেবে না। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

দল, সরকার ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের মন্ত্রী, এমপি, দলের যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিভাগীয় পদে থাকা নেতা, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দুইজন শীর্ষ নেতা, যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুইজন নেতা, যুব মহিলা লীগের দুইজনসহ বেশ কিছু নেতা নজরদারিতে রয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতা, স্থানীয় নেতাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব নেতা সম্পর্কে সংবাদপত্রে ও মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য, বিভিন্ন সংস্থার গোপন জরিপ ও সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দের পাঠানো তথ্যসমূহ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এমনকি ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কে কী করছেন তার তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক প্রথম খবরকে জানান, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দলে গ্রুপিং-কোন্দল সৃষ্টিকারী, দলকে ব্যবহার করে নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীদের আর ছাড় দিবেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যাদের বিরুদ্ধে সু নির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে এবং প্রমাণিত হবে তাদের দলীয় পদ হারাতে হবে এবং আগামীতে কোনো পদ পাবেন না।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শ্রী পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য বলেছেন, ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানীকে পদচুত্য করার বিষয়টিকে হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এতোটাই রঙিন যে এই রঙের খেলায় অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে, সেগুলোও কি এখন বের হয়ে আসবে কিনা কে জানে বলছেন দলের ত্যাগী নেতারা। তারা বলেন, দলে কিছু সুবিধাভোগীর জন্ম হয়েছে। এদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণেই সরকারের ইমেজ কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যা করেছেন, সেটাই করা উচিত ছিল। এতে এই বার্তা স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোনো ধরনের অন্যায়ের স্থান নেই।

আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ শাখার সম্মেলন করার নির্দেশ দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সারাদেশে দলের জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর হার্ডলাইনে যাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নেতাকর্মীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনও প্রধানমন্ত্রীর কাছে রয়েছে। যেসব নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছে, তারা কেউই ছাড় পাবে না। তবে সবার বিরুদ্ধেই দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

দলের যত বড় নেতাই হোক না কেন, অপকর্ম করে কেউ ছাড় পাবে না। অনেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। তাই যারা দলের নামে, পদের নামে অপকর্ম করার চিন্তা করছেন, তাদের সতর্ক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।’

অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে সরকার। অন্যায় অনিয়ম যেই করুক ছাড় দেয়া হবে না। অন্যায় যে করবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share this post

PinIt

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top